ফরজ নামাজের পর দোয়া ও কি কি আমল পড়তে হয় জেনে নিন

ফরজ নামাজের পর দোয়া ও আমল

আজ আমি আপনাদের সাথে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া ও কি কি আমল পড়তে হয় তা নিয়ে আলোচনা করবো। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। যা পূর্বে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ছিল। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এই পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিয়ে এসেছেন। যেন তার উম্মত প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারে। আর নিজের কৃত গুনার জন্য প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া করতে পারে। যার এক ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে দশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার সওয়াব পাওয়া যায়। কেননা, কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম নামাজের হিসাব নিবেন বলে নবী কারীম (সাঃ) কে জানিয়েছেন। এই জন্য রাসুল (সাঃ) পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আমল ও জিকির আজকার পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাহলে চলুন বন্ধুরা, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর কি কি দোয়া পড়তে হয় এবং ফরজ নামাজের পর দোয়া ও আমল হিসাবে কি পাঠ করতে হয়। সে সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।

ফরজ নামাজের পর দোয়া সম্পর্কে রাসূল (সাঃ)

বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ফরজ নামাজের পর জিকির আজকার করতেন এবং তিনি তার উম্মতকেও তা পাঠ করতে বলেছেন। আবার অনেক হাদিসে শিখানো হয়েছে, ফরজ নামাজের পর দোয়া ও আমল সম্পর্কে। একদা নবী কারীম (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হল, কোন দোয়া কবুলের অধিক সম্ভাবনা রাখে? তিনি ইরশাদ করলেন, গভীর রাতের দোয়া আর প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া। (সহিহ তিরমিজি: ৩৪৯৯)
হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) যে গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও দোয়া পড়তেন তা নিচে তুলে ধরা হলো।

ফরজ নামাজের পর কি কি দোয়া পড়তে হয় তা হলো,

১। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পরে উচ্চস্বরে এক বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি তাকবির (আল্লাহু আকবার) দ্বারা রাসুল (সাঃ) নামাজের সমাপ্তি সম্পর্কে অবহিত হতাম। (বুখারি ও মুসলিম)

উচ্চারনঃ আল্লাহু আকবার।
অর্থঃ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ বা আল্লাহ মহান।

২। হজরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ফরজ নামাজের সালাম ফেরাতেন। তখন তিনি তিনবার ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়তেন। (বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ)

আরবি উচ্চারনঃ أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
বাংলা উচ্চারনঃ আস্তাগফিরুল্লাহ
অর্থঃ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া হিসাবে এই আস্তাগফিরুল্লাহ বাক্যটি তিন বার পাঠ করতে হয়। (সহিহ মুসলিমঃ ১৩৬২)

ফরজ নামাজের পর বিশ্ব নবীর দোয়া

১। হজরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলু (সাঃ) যখন ফরজ নামাজের সালাম ফেরাতেন। তখন তিনি তিন বার ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়ার পর এই দোয়া টি এক বার পড়তেন,

আরবি উচ্চারনঃ اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ

বাংলা উচ্চারনঃ উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম, ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারকতা ইয়াজাল জালালি ওয়াল ইকরাম।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার গুণবাচক নাম সালাম। তুমি শান্তিদাতা। তুমি কল্যাণময়। তুমি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া হিসাবে এই দোয়াটি এক বার পাঠ করতে হয়। (মুসলিম শরিফঃ ১৩৬২)

২। হজরত মুগিরা ইবনে শু’বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলু (সাঃ) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া টি এক বার পড়তেন,

আরবি উচ্চারনঃ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيْرٌ اَللَّهُمَّ لاَ مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ

বাংলা উচ্চারনঃ উচ্চারণঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু। লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু। ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। আল্লাহুম্মা লা-মানিয়া লিমা আতাইতা। ওয়া-লা মুতিয়া লিমা মানা’তা ওয়ালা ইয়ানফাউ জাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দু।

অর্থঃ আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক। তার কোনো শরিক নেই। সার্বভৌমত্বের মালিক তিনি। সকল প্রশংসা তার। তিনি সব কিছুর ওপর সামর্থ্যবান। আপনি দিলে কেউ বাঁধা দিতে পারে না। আপনি না দিলে কেউ দিতে পারে না, কেউ উপকার করতে পারে না।

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া হিসাবে এক বার পড়তে হয়। ( সহিহ বুখারী ও মুসলিম)

ফরজ নামাজের পর আয়তাল কুরসী

আয়াতুল কুরসী শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার আয়াত। তাই আমাদের উচিত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া হিসাবে আয়তাল কুরসী পাঠ করা। হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ঘরে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা হয় সেখান থেকে শয়তান পালাতে থাকে। (মুসতাদরাকে হাকিম)

আরবি উচ্চারনঃ اللّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيم

বাংলা উচ্চারনঃ আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বিয়্যুম লা তা’খুজুহু সিনাত্যু ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিছছামা ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্। মান যাল্লাযী ইয়াস ফায়ু ইন দাহু ইল্লা বি ইজনিহি ইয়া লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খল ফাহুম ওয়ালা ইউ হিতুনা বিশাই ইম্ মিন ইল্ মিহি ইল্লা বিমা সাআ ওয়াসিয়া কুরসিইউ হুস ছামা ওয়াতি ওয়াল আরদ্ ওয়ালা ইয়া উদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলিয়্যূল আজীম।

অর্থঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছো এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।

ফরজ নামাজের পর আমল সমূহ

মুমিনের প্রতিটি কাজ ও মুহূর্ত এক ধরনের আমল ও ইবাদত। বান্দার সবকিছু যখন আল্লাহর হুকুম ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নত অনুযায়ী হয়। তখন সবকিছু ইবাদতে পরিণত হয় এবং সওয়াবযোগ্য হয়। আল্লাহ তাআলা তখন বান্দার জন্য সবকিছু পুণ্যময় করে দেন।

অন্য সব কিছুর মতো পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আমল রয়েছে। যে আমল গুলো করলে বান্দার জীবন সুন্দর, বরকতময় ও সুশৃঙ্খল হয়। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেন, প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া ও আমল আছে, যে ব্যক্তি দোয়া ও আমল করে বা কাজে লাগায়। সে কখনো ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। (সহিহ মুসলিম, হাদিসঃ ১২৩৭)

নিম্নে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আমল গুলো তুলে ধরা হলো,

১। যে ব্যাক্তি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আমল হিসাবে, ﺃﻟﻠﻬﻢ ﺃﺟﺮﻧﻲ ﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺭ ‘আল্লাহুম্মা আজিরনী মিনান নার’ সাত বার, ফজর ও মাগরিবের পর পাঠ করবে। সেই ব্যাক্তি ঐ দিনে বা রাতে মারা গেলে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি করে দিবেন।

২। কোন মুমিন বান্দা যদি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আমল হিসাবে, সূরা ইখলাস, ফালাক্ব ও সূরা নাস, ৩ বার করে পড়ে। রাসূল (সা.) বলেন, সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো পাঠ করলে তোমার আর কিছুরই দরকার হবে না।

ফরজ নামাজের পর যে আমল করলে রাসূল (সাঃ) শাফায়াত করবেন

১। (৭) দরুদ শরীফ ১০ বার, ফজর ও মাগরিবের পর। কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.) এর শাফা’আত লাভ করবে।

আরবি উচ্চারনঃ اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ. وَّعَلٰى اٰلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى اِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى اٰلِ اِبْرَاهِيْمَ’ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ. اَللّٰهُمَّ بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ. وَّعَلٰى اٰلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى اِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى اٰلِ اِبْرَاهِيْمَ. اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ.

বাংলা উচ্চারনঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাই তা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মদিউ, ওয়া আলা আলি মুহাম্মদিম, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা, ওয়া আলা আলি ইবরাহিমা, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।

অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর এই রুপ রহমত নাজিল করো, যেমন টি করেছিলে ইব্রাহিম ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ! তুমি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এবং তার বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করো, যেমন বরকত নাজিল করেছিলে ইব্রাহিম ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়।

২। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আমল হিসাবে ﺿﻴﺖ ﺑﺎﻟﻠﻪ ﺭﺑﺎ ﻭﺑﺎﻹﺳﻼﻡ ﺩﻳﻨﺎ ﻭﺑﻤﺤﻤﺪ ﻧﺒﻴﺎ ” রাদ্বীতু বিল্লাহি রাব্বা, ওয়াবিল ইসলামি দ্বীনা, ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিয়্যা’ ৩ বার ফজর ও মাগরিবের পর পড়লে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) তার হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর আল্লাহ তাআলা উক্ত ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করবেন।

৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আমল হিসাবে একশত বার
«سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ».সুব্‌হানাল্লা-হি ওয়াবিহামদিহী পড়বে। তার জীবনের পাপসমূহ মুছে ফেলা হবে, যদিও তা সাগরের ফেনারাশির সমান হয়ে থাকে। (বুখারী ৭/১৬৮, নং ৬৪০৫; মুসলিম ৪/২০৭১, নং ২৬৯১)

মহান আল্লাহ তায়ালা সারা বিশ্বের সকল মুমিন মুসলিম নারী পুরুষ কে উপরে উল্লেখিত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া ও আমল গুলো যথাযথ ভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More